Dua from Quran

ঘটনাভিত্তিক স্টাইলে কুরআন পড়ার উদাহরণ

মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়ার সুবাদে আমরা প্রায় সবাই হয়তো বা ছোটবেলা থেকেই ইবলিশের সিজদাহ না করার ঘটনাটা জেনে আসছি। কেউ যদি সূরা বাক্বারার অনুবাদ দিয়ে কুরআন পড়া শুরু করে তাহলেও সে এই কাহিনী শুরুর দিকেই পাবে। সূরা বাকারাহ’র ৩৪ নং আয়াত পড়ে কি এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে শুধু একবার আল্লাহর আদেশ অমান্য করার জন্য ইবলিশকে এমন চিরস্থায়ী শাস্তি দেয়া হয়েছে? আমাদের রব কি শাস্তি দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন? আস্তাগফিরুল্লাহ। এতে কি ইবলিশের প্রতি একটা সফট কর্ণার সৃষ্টি হতে পারে যেখানে মনে হবে বেচারা সামান্য একটা ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি পেল?

এমনটা মনে হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না। অন্তত নিজেদের মনে না হলেও আমাদের সন্তানদের মনে এমন প্রশ্ন জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ আর আমাদেরটার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

আমাদের সন্তান যদি এহেন প্রশ্ন নিয়ে আসে আমাদের কাছে? আমাদের উত্তর কী হবে? আমরা কি আস্তাগফিরুল্লাহ বলে বলবো এসব প্রশ্ন করতে হয় না? তাতে কি ওদের মন থেকে প্রশ্নটা মুছে যাবে নাকি উল্টা ইসলামের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা তৈরি হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আমাদেরকে কুরআনই দিয়ে দিচ্ছে!!

কিভাবে?

আসলে আমাদেরকে এই ঘটনাটা শুধু একটা সূরা থেকে নয় বরং অন্য আরো যেসব সূরায় আছে সবগুলো একসাথে করে পড়তে হবে….এই ঘটনাটা কুরআনের কয়েকটি  সূরায় বিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো-

১. সূরা বাক্বারাহ : ৩০-৩৮ নং আয়াত

২. সূরা আরাফ : ১১-২৫ নং আয়াত

৩. সূরা হিজর : ২৮-৪৩ নং আয়াত

৪. সূরা ইসরা : ৬১-৬৫ নং আয়াত

৫. সূরা কাহাফ : ৫০ নং আয়াত

৬. সূরা সা’দ : ৭১-৮৫ নং আয়াত

৭. সূরা ত্বা হা : ১১৫-১২৩ নং আয়াত

সূরা আরাফের ১১-২৫ নং আয়াত পড়লেই কিন্তু সূরা বাক্বারার ৩৪ নং আয়াত পড়ে যে ভুল ধারণা তৈরির সম্ভাবনা থাকে সেটা দূর হয়ে যাবে। কারণ আমরা বুঝবো যে শয়তানের অপরাধ মূলত এটা ছিল না যে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিল, বরং সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, তার আদেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আমাদের রব যিনি রাহমানুর রাহিম তিনি ইবলিসকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছিলেন, তার দোয়া কবুল করেছিলেন।

সেই দুআ কবুল হওয়ার পর শয়তানের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? সে আল্লাহর সামনে ঘোষণা দিল যে এই আয়ু সে ব্যয় করবে আদম সন্তানকে পথভ্রষ্ট করার কাজে!

আর অবাধ্যতা করার কারণ হিসেবে সে কী বলেছিল? সে আগুনের তৈরি আর আদম আলাইহিস সালাম মাটির, অতএব উনাকে সিজদাহ করার আদেশের কোনো মানেই হয় না! তার বক্তব্যের নির্যাস ছিল যে এহেন ফালতু আদেশ দিয়ে আল্লাহই তাকে পথভ্রষ্ট হতে বাধ্য করেছেন!! মানে দোষটা যেন ওর না, আল্লাহর!

খেয়াল করলে দেখবো যে এ ধরনের কথা আমাদের চারপাশের অনেক মানুষই বলে থাকে – আল্লাহ হিদায়াত দিলে নামাজ পরা /পর্দা করা শুরু করবো অথবা আল্লাহই তো আমাকে এমন বানাইছেন সেজন্য আমার পাপ কাজ করতে এত ভালো লাগে। অর্থ্যাৎ নিজেদের অপকর্মের দায়ভার তারা বেমালুম আল্লাহর উপর চালিয়ে দেয়। উপরের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে এহেন কথা প্রথম বলেছিল ইবলিশ!!

তওবা করার জন্য যথেষ্ট অবকাশ পাওয়া সত্ত্বেও ইবলিশের দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণের পূর্ণচিত্র আমরা পাই সূরা আরাফে। এই বিষয়ক আয়াত গুলো পড়লে কিন্তু আমাদের রবকে খুব, খুব আপন লাগা উচিৎ, যিনি তার বান্দার বক্তব্য শোনেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন।

আমরা কি জানি যে এই সুযোগ মানুষ পরকালেও পাবে এবং সেটার অপব্যবহার করবে? মানে পরকালে নিজের কৃতকর্মের পরিণতিকে চোখের সামনে দেখে মানুষ সমানে মিথ্যা কথা বলতে থাকবে। তখন কী হবে?

“আজ আমি তাদের মুখে সীল মোহর লাগিয়ে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে, আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা  ইয়াসিন : ৬৫) 

কী ভয়ংকর না? আচ্ছা এগুলো পড়লে কি হতাশ লাগে? বিশেষ করে সূরা আরাফের ১৬-৩৩ আয়াত গুলো যেখানে শয়তান প্রতিজ্ঞা করছে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে সিরাতুল মুস্তাকিম এ থাকার পথ কঠিন করে তোলার ব্যাপারে?

হুম। শুধু সূরা আরাফ থেকে পড়লে শয়তানের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জের কথা পড়লে খুব হতাশ লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই কথোপকথনের আরেকটা দিক আমরা পাই সূরা বনী ইসরাঈলে। সেখানে ইবলিশের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জের বিপরীতে আল্লাহ কিন্তু পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন। সূরা বনী ইসরাইলের ৬২-৬৫ নং আয়াত মিলিয়ে পড়লে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা উচিৎ। সেইসাথে আকুল হয়ে দুআ করা উচিৎ যে আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি যাদের ওপর শয়তানের কোন প্রভাব কাজ করবে না। 

আরেকটা কাজ করা যায় এই আয়াতগুলো পড়লে। শয়তানের যে কৌশল গুলোর কথা আল্লাহ উল্লেখ করেছেন সেগুলো নিয়ে চিন্তা করা যায় যে আমাদের জীবনে এটার প্রয়োগ কী/ উদাহরণ কী। যেমন ইবলিশ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে তার আওয়াজ দ্বারা, পদাতিক বাহিনী নিয়ে আমাদের আক্রমণ করবে। আমাদের অর্থ সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে শরিক হবে। আমরা ভাবতে পারি- 

১) শয়তান সন্তান সন্ততিতে শরীক হবে এটার উদাহরণ কী হতে পারে?

২) শয়তান অর্থ সম্পদে শরীক হবে এটার উদাহরণ কী হতে পারে?

৩) বর্তমান সময়ে শয়তানের আওয়াজের উদাহরণ কী হতে পারে? ইত্যাদি…. 

হতে পারে কেউ হারাম পথে উপার্জন করে এমন বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে বের হতেই পারছেন না। সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ইবলিশ তার ধন সম্পত্তিতে অংশীদার হয়ে গেছে। এভাবে নিজের জীবন টাকে ভালো মত বিশ্লেষণ করা দরকার যে কোন ব্যাপারে শয়তানের ধোঁকায় আমরা আল্লাহর থেকে দূরে চলে গেছি অনেক। 

তাহলে এভাবে কুরআন পড়ার সুবিধাগুলো কী কী?

Scroll to Top